মুদ্রাস্ফীতি যেন বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও অজগরের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে

বিয়ে করা ইচ্ছে এখন যেন স্বপ্ন নয়, দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে!

বেসরকারি চাকরিজীবী সাগর আহমেদ  সম্প্রতি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মেয়ে দেখা থেকে শুরু করে পাকা কথা দেয়া শেষে যখন পরিবার নিয়ে বিয়ের আয়োজনের হিসাব কষতে বসলেন তখন খরচ দেখে মাথায় হাত। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ বাজারে গহনা, পোশাক, সাজসজ্জা, হল ভাড়া এবং আপ্যায়ন বাবদ মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের বিয়ের খরচ কম করে হলেও৮- ১০ লাখ টাকা।


বাংলাদেশের সমাজে বিয়েকে সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি বলে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে সাজসজ্জা, খাওয়া-দাওয়া, নানা ধাপের আয়োজন, উপহার-উপঢৌকনের সমারোহে চাঁদের হাট বসে দুটি পরিবারের এ মেলবন্ধনকে কেন্দ্র করে। আয়োজনের পরিধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ব্যয়। এমনিতেই ব্যয়সাধ্য এ আয়োজন, যা বর্তমান বাজারে এসে আরও বেড়ে হয়েছে আকাশচুম্বী।


বিয়ে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চাইলে সাগর আহমেদ
বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ যদি ছোট আয়োজন করেও বিয়ে করতে চায়, তাহলে অনায়াসে ৮-১০  লাখ টাকা খরচ হয়ে যাবে। ৫ লাখের নিচে আয়োজন করে বিয়ে করা একরকমের অসম্ভব। শুধু পরিবারের হাতে গোনা কয়েকজন নিয়ে বিয়ে করতে চাইলেও তিন লাখের নিচে বিয়ে করা সম্ভব নয়। 

পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ও বিয়ের বাজার বিশ্লেষণ করে শামিমের কথার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়। বর্তমানে বিয়ের বাজারে নিমেষেই ৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে যাওয়া একেবারে মামুলি বিষয়। বিশেষ করে বর-কনের গহনা, সাজসজ্জা আর কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া দিয়ে মধ্যবিত্তের টান পড়ে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ে। অনেকের আবার সঞ্চয় শেষ করে আত্মীয়স্বজন থেকে টাকা পর্যন্ত ধার করতে হয়।

 


বিয়ের ক্ষেত্রে কনের গহনার হিসাব আসে সবার আগে। সম্প্রতি সন্তানকে বিয়ে করিয়েছেন এমন কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যায়ে বর্তমান সময়ে এসে বিয়ের ক্ষেত্রে কনেকে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ ভরি স্বর্ণ দেয়া লাগে। বর্তমানে স্বর্ণের ভরি ১ লাখ টাকার ওপরে। ১ লাখ টাকা ভরি ধরে হিসাব করলেও স্থানভেদে মজুরিসহ এক ভরি স্বর্ণের গয়নার দাম পড়ে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।
                                                                     

এ ব্যাপারে কয়েকটি স্বর্ণের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিয়ের ক্ষেত্রে তাদের আলাদা করে বানানো বেশির ভাগ গয়না ২ থেকে ৩ ভরির ওপরে। ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে সীতা হার জাতীয় গহনার দাম শুরুই হয় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকায়। এ ছাড়া হাতের চুড়ি ,গলার চেইন, মাথার টিকলি-টোপর, আঙুলের আংটি মিলিয়ে দাম পড়ে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। এতে বর্তমান বাজারে কনেকে সাধারণ মানের গয়না দিয়ে বিয়ে করতে চাইলেও শুধু গয়না বাবদ খরচ পড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা।
বসুন্ধরা সিটিতে ছেলের নববধূর জন্য গহনা কিনতে আসা এক এক অভিভাবকের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘মনস্থির করেছিলাম ছেলের বউকে হাতে, কানে, গলায় সোনার গহনা দেব। বিয়ে যেহেতু আজীবনের ব্যাপার, এসব তো একবারই কেনা হয়। কিন্তু এসব দিতে যে খরচ লাগবে তাতে গলার হার আর হাতের বালা ছাড়া আর কিছু সোনার দেয়া সম্ভব নয়। শুধু গলার হার আর হাতের বালা এবং একটি আংটির দামই পড়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা। এত টাকা যদি গহনার পেছনে যায়, বাকি খরচ তো পড়েই আছে। খরচের কথা চিন্তা করে অনেকটা বাধ্য হয়েই দুই পরিবার মিলে চিন্তা করেছি বাকি যা লাগবে এমিটেশন গোল্ড দিয়ে চালিয়ে দেব।’
এছাড়াও তিনিঁ বলেন, ‘যত জ্বালা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষদের। সমাজ কী বলবে, পাড়া-প্রতিবেশি কী মনে করবে–এসব চিন্তা করে আমরা জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু ছেলে-মেয়েদের বিয়ের পেছনে খরচ করে ফেলি। বর্তমান বাজারে মধ্যবিত্তদের জন্য বিয়ে করা একটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে এসে বেড়ে গেছে কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া। এক দশকে ঢাকার কনভেনশন সেন্টারগুলোর ভাড়া বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ঢাকার মধ্যে ২০০-৩০০ মানুষের কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া শুরু হয় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায়। মান অনুযায়ী অনেক কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা। উচ্চবিত্তরা মূলত পাঁচতারকা যেসব কনভেশন সেন্টার বা বলরুমে বিয়ে করে, সেসবের ভাড়া ক্ষেত্রবিশেষে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
                                                             
সদ্য বিবাহিত ওয়াশিবুর রহমান বলেন ভালো এলাকায় একটি কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া ৫০ হাজারের নিচে পাওয়া সম্ভব নয়। আবার ৫০ হাজার টাকায় যেসব কনভেনশন সেন্টার পাওয়া যায়, সেখানে ২০০-র বেশি মানুষের ব্যবস্থা করা যায় না। কেউ যদি ৩০০-৪০০ মানুষের জন্য কনভেশন সেন্টার ভাড়া করতে যান, তাহলে ১ লাখ টাকাই পড়বে সেন্টারের ন্যূনতম ভাড়া। এত টাকা না থাকায় উপায়ান্তর না দেখে এক আত্মীয়র বাসায় বাধ্য হয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করতে হয়েছে বলে জানান তিনি ।

সম্প্রতি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে একটি প্রাইভেট কোম্পানির কর্মকর্তা আবু সালেহ বলেন, ‘কী বিয়ে করব ভাই! আমার বেতনের থেকে বউয়ের শাড়ির দাম বেশি। ২৫ হাজার টাকার নিচে কাতানের ভালো কোনো শাড়ি নেই। বর্তমান সময়ে মেয়েদের বেনারসির থেকে কাতানের শাড়ি বেশি পছন্দের। এক শাড়িতেই যদি এত টাকা যায়, তাহলে বাকি কেনাকাটার জন্য তো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিয়ে করতে হবে।’
                                                                               

মিরপুর বেনারসি পল্লির বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ভালো মানের বেনারসির দাম ১০ হাজার থেকে শুরু হলেও পছন্দসই বেনারসির দাম অনেক ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। আবার বিভিন্ন মানের লেহেঙ্গার দাম ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়।

বিয়ের ক্ষেত্রে একজন কনের খরচ হিসাব করে দেখা যায়, বর্তমান বাজারে শুধু কনের খরচই হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা, যা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় রকমের খরচ। এ ছাড়া কনের খরচের পাশাপাশি বরের শেরোয়ানি-স্যুট থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচের পেছনে কম করে হলেও দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হয়। শুধু বর-কনের পোশাক ও সাজসজ্জার খরচই যেখানে সাত-আট লাখ টাকা, সেখানে বর্তমান বাজারে আয়োজন করে কম খরচে বিয়ে করা এক রকমের অলীক কল্পনা।

এদিকে বিয়ে মানে তো শুধু জাঁকজমক আর পোশাক-পরিচ্ছেদ না। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়ন বিয়েতে এক শাশ্বত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় প্রতিটি খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিয়েতে খাবারের খরচ বেড়ে বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ ব্যাপারে আরেক প্রাইভেট চাকরিজীবী রায়ান বিন আমিন নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, সম্প্রতি তার বিয়েতে ৩০০ জনের খাবারের খরচ পড়েছে আড়াই লাখ টাকা। এ ছাড়া বাবুর্চি খরচ পড়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা।

অনেকে নিজেরা বাজার বা বাবুর্চি খরচের ঝামেলা এড়াতে এসব দায়িত্ব কনভেনশন সেন্টারের ওপর ছেড়ে দেন। এতে খরচ আরও বাড়ে উল্লেখ করে সদ্য বিবাহিত ব্যাংকার মঈনুল হাসান শোভন বলেন, সম্প্রতি একটি কনভেনশন সেন্টারকে ২৫০ জন মানুষের খাবারের দায়িত্ব দিলে খরচ আসে ৩ লাখ টাকা। এর বাইরে তাকে ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বাবুর্চি খরচ।

বর্তমান প্রজন্মের বিয়ে মানেই ফটোগ্রাফি আর সিনেমাটোগ্রাফির আলোকশিল্প। দক্ষ ফটোগ্রাফের হাতে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এ মুহূর্তটি ধরে রাখতে চাইলে খরচ পড়ে ২০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত।

এ ব্যাপারে পেশাদার ওয়েডিং ফটোগ্রাফার রাকিব হোসেন বলেন, ফটোগ্রাফির নানা ধরনের প্যাকেজ আছে। অনেকে কমে ফটোগ্রাফি করতে চাইলেও বিয়েতে ভালো মানের ফটোগ্রাফার ও ভালো সিনেমাটোগ্রাফারের খরচ ৫০ হাজারের ওপরে ধরাই শ্রেয়।
                                                                     

বিয়ে নিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মত: বর্তমান বাজারব্যবস্থায় সন্তানের বিয়ে দিতে চাইলে হয় সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, না হলে নানা জায়গা থেকে ঋণ করে বা টাকা ধার নিয়ে সন্তানের বিয়ে দিতে হচ্ছে। বিয়ের খরচ কমাতে দুই পক্ষ মিলে খরচ ভাগাভাগি করে সাদামাটা আয়োজন করলেও প্রতি পক্ষের ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে

বাঙালি সংস্কৃতি মেনে আড়ম্বর এবং আয়োজনের মাধ্যমে সন্তানকে বিয়ে দেয়া এখন মধ্যবিত্তদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির বাজারে বিয়ের খরচ মেটাতে অনেকের উঠছে নাভিশ্বাস। অনেকে আবার বাজার স্বাভাবিকের আশায় কেবল আখত এবং রেজিস্ট্রি করে পরে অনুষ্ঠান 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *